Ekhon Bangla

“বিচার দেরিতে হলেও বিচার শূন্য নয়” লেখায় সুবল সরদার, অ্যাসিস্ট্যান্ট কোর্ট অফিসার,কলকাতা হাইকোর্ট

বিলম্বিত বিচার অবিচার ছাড়া কিছু নয়। আমাদের কলকাতা হাইকোর্টকে justice of temple বলে। কেউ কেউ মুক্তির মন্দির বলে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী কলকাতা হাইকোর্ট ভারতবর্ষের প্রাচীনতম হাইকোর্ট যা চার্টার হাইকোর্ট নামে পরিচিত।

আইন সভায় আইন তৈরি হয়। হাইকোর্ট বা সুপ্রীম কোর্ট সেই আইনের ব্যাখ্যা দেয়। সরকার হাইকোর্ট বা সুপ্রীম কোর্টের সেই আদেশ প্রয়োগ করে। সরকার যখন হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের আদেশ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয় কিংবা গড়িমসি করে, হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্ট তখন আমাদের সংবিধানে যে মৌলিক অধিকার আছে যেমন ম্যান্ডামাস,হেবিয়াস কর্পাস,কোয়ারান্টো,সার্টিওরারি ইত্যাদি আদেশ প্রয়োগ করে।

সম্প্রতি সুয়ো মোটো বা স্বতঃপ্রণোদিত আদেশ এখন জনগণের রক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করে। সন্দেশখালির ঘটনায় আমাদের মহামান্য কলকাতা হাইকোর্ট সুয়ো মোটো আদেশ জারি করে। মণিপুর কিংবা সম্প্রতি আর.জি .করের ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট suomoto আদেশ জারি করে। এইভাবে আইন জনগণের মৌলিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করে।

কিন্তু জানতে হবে এরপরও কেন এতো মামলার পাহাড় জমে যাচ্ছে। সরকার অনেক সময় হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের আদেশ প্রয়োগ করতে গড়িমসি করে। কোন তুচ্ছ প্রশাসনিক আদেশ প্রয়োগ করতেও সরকার হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়। কারণ অকারণে মামলা রুজু করার জন্যে মামলার পাহাড় জমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।

সম্প্রতি রাজনৈতিক মামলা এতো এত বেশি হচ্ছে, যেখানে জনগণের বিচার থমকে যাচ্ছে। এইভাবে মামলা জমতে জমতে আমাদের কলিকাতা হাইকোর্টে কয়েক হাজার মামলা জমে আছে। এই প্রসঙ্গে বলা যায় সেপ্টেম্বর ,২৪ সাল পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন হাইকোর্টে প্রায় ৬২. ০০০ কেস পেন্ডিং আছে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। আমাদের কলিকাতা হাইকোর্টে ২০৫,২০৩ এরও বেশি কেস জমে আছে। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি প্রতি বছর প্রায় ৬০০০০ এর ও বেশি মামলা রুজু হয় এবং নিস্পত্তি হয় প্রায় ৪২০০০ এর মতো। খুব স্বাভাবিক কারণে আমাদের হাইকোর্টে মামলার পাহাড় জমতে থাকে। ওই জমে থাকা মামলা নিস্পত্তি হওয়া এখন বিশ বাঁও জলে।

সুপ্রিম কোর্টও কয়েক হাজার মামলার ভারে জর্জরিত । সেপ্টেম্বর, ২৪ সাল পর্যন্ত ৮০,৪৩৯ কেস জমে আছে সুপ্রিম কোর্টে দ্য হিন্দু পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী।

সরকারি কর্মচারীদের ডিএ মামলার কথা বলা যায় কবে নিস্পত্তি হবে কেউ জানে না। শুধু তারিখের পর তারিখ নিয়ে আশায় দিন গুনতে হয়। আর জি করের মামলা নিয়েও তাই হচ্ছে। জানি না এখানে কামদুনির পুনরাবৃত্তি হবে কিনা। কোনও সরকার যদি বিচার পাওয়ার প্রতিবন্ধক হয় বিচার পাওয়া দুরুহ হয়।

এখান থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় quicker than never i.e. better পদ্ধতিতে দ্রুত রায় দান করা অন্যথায় কেস শুধু জমা হয়ে পড়ে থাকবে।

বর্তমানে বিচার ব্যবস্থাকে সক্রিয় করার জন্যে ন্যায় সংহিতা এসেছে। পয়লা জুলাই ২০২৪ থেকে কার্যকরী হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কে রায় দেবেন, আর কে সে রায় মানবেন? সিস্টেম যদি ভুল থাকে দ্রুত বিচার পাওয়ার অন্তরায় হয়ে ওঠে । এই জন্যে কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম সিস্টেম তুলে দিতে চেয়েছে (যেভাবে হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ করা হয় )।

Stitch in time saves nine – এইভাবে আমাদের বিচার ব্যবস্থা চলে না। সময়ের বিচার অসময়ে পেলে অবিচার ছাড়া কিছু নয়। তাই ন্যায় সংহিতা দ্রুত ন্যায় দান করতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। অবশ্য এটা মনে রাখা দরকার বিশ্বের জনবহুল দেশে মামলার সংখ্যা বেশি হবে এটা সঙ্গত কারণ। তবু বিচার ব্যবস্থার উপর জনগণ আস্থাশীল এবং শ্রদ্ধাশীল । দ্রুত রায় দানের মাধ্যমে জনগণ হাইকোর্টের কল্পতরু হওয়ার কোন কারণ দেখে না। তারা সদা বিচার ব্যবস্থা উপর আস্থাশীল থাকে ।

তবু বলি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্যে Fast Track Court, Commercial court আছে। লোক আদালত আছে। কিন্তু দ্রুত রায় দান কোথায়? তবে বলা যায় বিচার ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ নেই। বিচার দান নিয়ে ক্ষোভ নেই। কেবল বিলম্বিত বিচার নিয়ে ক্ষোভ। দ্রুত বিচার দান অমূল্য হাসির মতো বিধাতার দান। সর্বোপরি বলি হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্ট যখন বিচার করতে ব্যর্থ হয় সময়ের পথে হেঁটে তখন সময় বিচারকের আসনে বসে ন্যায় দান করে। প্রতিকার থাকা সত্ত্বেও বিচার বাণী প্রকাশ্যে নীরবে কাঁদে এর থেকে দুর্ভাগ্য আর কিছু থাকে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *